হে হুতোম পন্ডিত, আপনি আমাদিগের নিকট আবির্ভূত হইয়া মহারাণী মমতার কাব্যবিন্যাস করিয়া কৌতুকরসে আমাদিগকে সিক্ত করিয়াছেন। অদ্য আমাদিগের মানসপটলে আবির্ভূত হইয়া আপনি এই পক্ষকালের কৌতুক বর্ণনা করিয়া আমাদিগকে আনন্দ প্রদান করুন। কি কারণে প্রজাগণ কৌতুক পাইয়াও দুঃখে জীবনযাপন করিত? এই বলিয়া রাজা জনার্দন চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া, দুই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ মুখগহ্বরে প্রবেশ করাইয়া হুটাহুট শব্দবাণ নিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাত পন্ডিত হুতোম আবির্ভূত হইলেন।
“হে বৎস জনার্দন, মহারাণী মমতা ক্রমশ বঙ্গবর্ষের প্রজাগণের সমীপ কৌতুকোপাদানরূপে প্রতীত হইবার বাসনা করিতেন। তিনি স্বল্পজ্ঞানভূষিতা হইয়াও বিজ্ঞরূপ প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত সর্বদা তৎপর থাকিতেন। গণিতশাস্ত্র বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। অথচ তাঁহার ভাষ্যদ্বারা তিনি গণিত বিষয়ে অদ্ভূত সংখ্যা প্রদান করিলে প্রজাগণ হাস্যরস অনুভব করিয়া কিয়দকাল সুখী থাকিত”।
“একদা বঙ্গবর্ষে দীনদরিদ্র প্রজাগণ বৎসরে শতদিবস মৃত্তিকা ক্ষণন করিয়া জীবিকার্জন করিত। মহারাণীর রাজত্বকালে প্রজাগণ উক্ত জীবিকা হইতে বঞ্চিত হইয়াছিল। এবং পঞ্চবিংশতি দিবসও মৃত্তিকা ক্ষণন করিতে অপারগ হইয়া উক্ত উপার্জন হইতে বঞ্চিত হইয়াছিল। মহারাণী মমতা এইরূপ সত্য অস্বীকার করিয়া গণিতশাস্ত্রাবলম্বন করিয়া বলিয়াছিলেন, নবতিশতাংশ সেন্টিগ্রেড মৃত্তিকা ক্ষণন হইয়াছে। যাহারা ইহা অবলোকন করিতে পারেন নাই তাহারা অন্ধকূপে পতিত হউন। পুরাকালে মৃত্তিকা ক্ষণনের পরিমাপ ‘কিউবিক ফিট’ দ্বারা পরিগণিত হইত। কোন বস্তুর তাপ নির্ধারণ করিবার পরিগণককে সেন্টিগ্রেড বলা হইত। গণিতশাস্ত্রে অজ্ঞ মহারাণী মমতা তাঁহার এইরূপ বিজ্ঞসুলভ ভাষ্যদ্বারা প্রজাগণকে হাস্যরসে সিক্ত করিয়াছিলেন”।
“হে বৎস জনার্দন, যে সকল রাজ্যে রাজা এবং রাণীগণ মূর্খ হইতেন তাঁহাদের রাজ্যে প্রজাদের দুঃখ দুর্দশার অন্ত ছিলনা। মহারাণী মমতার রাজত্বকালে বঙ্গবর্ষে প্রজাগণ পরম দুঃখে কালযাপন করিত। তাঁহার রাজত্বকালে কৃষকেরা স্বীয় উৎপাদনের অনুচিত মূল্য পাইয়া আত্মহনন করিত। তাঁহার অনুগামীবৃন্দ অসংখ্য শিক্ষাপীঠ আক্রমণ করিত। শিক্ষক তথা শিক্ষানবীশ উভয়বর্গ ইহাদের আক্রমণের আশঙ্কায় সর্বদা ভীত থাকিতেন। রাণীর অভিশাপে প্রত্যহ শতাধিক শিশু জননী জঠর হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াই প্রাণত্যাগ করিত। রাজধর্ম পালন করিতে অকৃতকার্য হইয়া মহারাণী মমতা প্রজাগণের বাক্যবাণে সর্বদা জর্জরিত হইতেন। সেই রাণীর রাজত্বকালে বঙ্গবর্ষে দুর্ভিক্ষসম পরিস্থিতির আবির্ভাব হইয়াছিল”।
এইরূপ বর্ণনা করিয়া হুতোম পন্ডিত নিজ পক্ষবিস্তারপূর্বক নিঃশব্দে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করিলে রাজা জনার্দন ব্যথিত হইয়া চিন্তামগ্ন হইলেন।

0 comments:
Post a Comment